দুর্গাপূজার মণ্ডপে বামপন্থীদের বইয়ের স্টল দেওয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্কের আগুন জ্বলেছিল, এবার তা পরিণত হলো এক রক্তগরম মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া ফতোয়া এবং বিজেপি বিধায়কদের স্টল ভাঙার হুঁশিয়ারির পর এবার সরাসরি ‘সনাতনী’ সমাজকে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন বর্ষীয়ান সিপিআইএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে গিয়ে উল্টে বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ ও বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষের শাণিত যুক্তি ও নির্মম কটাক্ষের মুখে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ল লাল শিবির।
বিতর্কের সূত্রপাত বিকাশরঞ্জনের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামীদের নিশানা করে তিনি লেখেন— পুজোমণ্ডপের আশেপাশে ‘অসনাতনীদের’ বইয়ের স্টল করতে না দেওয়ার হুমকি আসলে গুন্ডাদের ভাষা। এরপরই একটি বিতর্কিত প্রস্তাব ছুঁড়ে দিয়ে বিকাশবাবু লেখেন— সনাতনীরা মণ্ডপের ভেতরে বইয়ের স্টল দিন, আর তথাকথিত অসনাতনীরা মণ্ডপের বাইরে স্টল করবে। পুজো শেষে কার কত বই বিক্রি হলো সেই হিসাব করে দেখা হোক সনাতনীরা গ্রহণযোগ্য না বর্জনীয়! ধর্মীয় উৎসবের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সনাতন সমাজকে এমন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া মাত্রই যেন মৌচাকে ঢিল পড়ল।
বিকাশ ভট্টাচার্যের এই অহঙ্কারকে মাটিতে নামিয়ে আনতে এক মুহূর্ত দেরি করেননি বরানগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। বিকাশবাবুকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘কাকা’ সম্বোধন করে সজলবাবু সাফ জানিয়ে দেন— “ছোটবেলা থেকেই পুজোমণ্ডপের পাশে গণশক্তির লাল শালু টাঙানো স্টল দেখে আসছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেখানে একটাও ক্রেতা দাঁড়িয়ে বই কিনতে দেখিনি! আর ক্রেতা না হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। ঠাকুর দেখতে মণ্ডপে আসেন ধর্মপ্রাণ সনাতনীরা; সেখানে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বই মানে না, যারা ধর্মকে আফিম বলে গালাগালি দেয়, তাদের মতাদর্শের বই মানুষ নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে কিনবে কেন?”
এখানেই থামেননি সজল ঘোষ। বামেদের শোচনীয় রাজনৈতিক পতনের আসল কারণ মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন— সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে লাগাতার অসম্মান করার ফলই আজ ভোগ করতে হচ্ছে সিপিএমকে। জনসমর্থন হারিয়ে বিধানসভা থেকে শূন্য হয়ে যাওয়ার পর এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাদের অবস্থা করুণ— ৩ ঘণ্টায় মাত্র ২০০ লাইক জোটে!
একই সুরে সুর মিলিয়ে লাল শিবিরের অতীত মুখোশ খুলে দেন বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষও। বিকাশ ভট্টাচার্যকে কড়া জবাব দিয়ে তিনি বলেন— “ভোটের ময়দানেই আপনাদের বাংলা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বই বিক্রির তুলনা তো কোন ছাড়! তবে মনে রাখবেন, ব্যানারে স্পষ্ট হরফে ‘দুর্গাপূজা’ না লিখলে এবার কোনো স্টলই খুলতে দেওয়া হবে না।” অতীতের কথা টেনে এনে তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, সনাতনীদের আরাধ্যা দেবী মা দুর্গা সম্পর্কে অতীতে বিকাশবাবুর করা কুৎসিত মন্তব্য কিন্তু বাংলার মানুষ আজও ভোলেনি। সব মিলিয়ে, পুজো যত এগিয়ে আসছে, সনাতনী ভাবাবেগের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের এই মরিয়া আক্রমণই যেন তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে আরও বেশি করে প্রকাশ্যে এনে দিচ্ছে।
