ভারতের সড়কপথে ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকেই যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি অভিযোগ ছিল, দেশের আইন ও নিয়মকানুন সবার জন্য সমান হলেও কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষ নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করেন। জাতীয় সড়কের টোল ছাড়ও সেই সুবিধাগুলোর অন্যতম।
জাতীয় সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সেই অর্থের একটি বড় অংশ আসে টোল আদায়ের মাধ্যমে। সাধারণ নাগরিক যখন নিজের উপার্জিত অর্থ থেকে নিয়মিত টোল দেন, তখন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধিদের বিনামূল্যে সেই সুবিধা পাওয়া অনেকের কাছেই বৈষম্যমূলক বলে মনে হয়েছে। নতুন প্রস্তাব সেই বৈষম্য কমানোর দিকেই ইঙ্গিত করছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ভিআইপি ও বিভিন্ন সরকারি পদাধিকারীদের টোল ছাড়ের কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ক্ষতি হয়। এই ছাড় সীমিত করা গেলে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের আয় বাড়বে, যা ভবিষ্যতে রাস্তা উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন অবকাঠামো তৈরিতে কাজে লাগানো যেতে পারে।এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বহুবার ভিআইপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন। লালবাতি সংস্কৃতি বন্ধ করার পর এবার টোল ছাড় কমানোর উদ্যোগ সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমানোর বার্তা দিতে চাইছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সেবক এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এমন পদক্ষেপ। যখন একজন মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়কও সাধারণ নাগরিকের মতো টোল দেবেন, তখন আইনের চোখে সমতার ধারণা আরও দৃশ্যমান হবে। এটি জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।তবে অন্য দিকও রয়েছে। অনেকের মতে, প্রশাসনিক কাজের প্রয়োজনে কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। জরুরি সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি তাদেরও প্রতিটি টোল প্লাজায় সাধারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কোন কোন পদে ছাড় থাকবে, তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রযুক্তির উন্নতির কারণে অবশ্য এই সমস্যা অনেকটাই কমে গেছে। ফাস্ট্যাগ ও স্বয়ংক্রিয় টোল সংগ্রহ ব্যবস্থার ফলে গাড়ি থামানো ছাড়াই টোল কাটা সম্ভব। তাই শুধুমাত্র সময় বাঁচানোর যুক্তিতে ব্যাপক টোল ছাড় বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের অধিকাংশই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ফলে টোল প্রদান তাদের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হওয়ার কথা নয়। বরং সবাইকে একই নিয়মের আওতায় আনা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
জাতীয় সড়কে ভিআইপি টোল ছাড় কমানোর উদ্যোগ কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি সমতা, স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গেও জড়িত। যদি পরিকল্পনাটি কার্যকর হয়, তাহলে ভারতের সড়কপথে দীর্ঘদিনের ভিআইপি সংস্কৃতি ভাঙার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
