পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে । আর ঠিক এই সন্ধি ক্ষণেই দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দ থেকে উঠে আসছে এক চাঞ্চল্যকর খবর। বিধানসভা ভোটের আগেই নাকি বসতে পারে বাজেট অধিবেশন ! আর এর পরই প্রশ্ন উঠছে কেন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি করা হলো না সংসদের বাজেট অধিবেশন? কেন এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে আবারও বসতে চলেছে সংসদের বিশেষ পর্ব? জানা যাচ্ছে, বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় পর্বের প্রধান আলোচ্যসূচিতে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ সংশোধন এবং সীমারেখা কমিশন বিল সংক্রান্ত আলোচনা হতে পারে । অনেকে একে জল্পনা বললেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এক সুপরিকল্পিত এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে তামিলনাড়ু— সর্বত্রই যখন নারী শক্তির গুরুত্ব বাড়ছে, তখন তাঁদের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই হয়তো মোদী সরকার সাজাচ্ছে নতুন এই রণকৌশল। মাত্র আড়াই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নরেন্দ্র মোদী সরকার নিয়ে এসেছিল ঐতিহাসিক ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের সেই যুগান্তকারী বিল পাস হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কিছু আইনি জটিলতায় তা কার্যকর হওয়া নিয়ে সংশয় ছিল। আগে শর্ত ছিল, নতুন জনগণনা এবং আসন পুনর্বিন্যাসের পরেই এই সংরক্ষণ কার্যকর হবে। কিন্তু মোদী সরকার এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চাইছে।
সূত্রের খবর, সরকার নিজের আনা আইনেই সংশোধন আনতে চলেছে। যাতে ২০২৯-এর লোকসভা ভোট নয়, বরং তার আগেই—অর্থাৎ আগামী বছরের উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন থেকেই মহিলারা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার বুঝে নিতে পারেন। এটি কেবল একটি আইনি সংশোধন নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মা-বোনেদের প্রতি মোদী সরকারের অটুট প্রতিশ্রুতির এক প্রতিফলনও ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আসন সংখ্যা নিয়ে যাতে কোনো রাজ্যের বঞ্চনা না হয়, তার সমাধান কী? আর এখানেই কেন্দ্রের দূরদর্শী চিন্তাভাবনার প্রকাশ। সরকার আনতে চলেছে ‘সীমারেখা কমিশন বিল’।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে ২৭২টি আসন। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আসন বৃদ্ধির ফলে কোনো রাজ্যের বর্তমান অনুপাত বা গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হবে না। কেন্দ্র নিশ্চিত করছে যে, বিকাশের পথে সব রাজ্য যেন সমানভাবে এগিয়ে চলতে পারে । তাই মোদী সরকারের এই পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে বিধানসভা ভোটের আগে মহিলা ভোটারদের মনে এক নতুন আশার আলো জাগাচ্ছে।
তবে এই মহৎ কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজন সংবিধানের ৩৬৮(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন। এর জন্য প্রয়োজন সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এখানে মোদী সরকার আসলে বিরোধীদের সামনে এক অগ্নিপরীক্ষা রেখে দিচ্ছে। নারী শক্তির ক্ষমতায়নে কি বিরোধীরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকে সমর্থন করবে? নাকি তারা আবারও বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে?
তবে বিজেপি তথা এনডিএ সরকার শরিকদের সঙ্গে নিয়ে এবং বিরোধী দলগুলোর সমর্থন আদায় করে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর। এটি কেবল রাজনীতির চাল নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে আরও মজবুত করার এক সৎ চেষ্টা। পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের ভোটের ঠিক আগে মোদী সরকারের এই কৌশল আসলে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এরই এক সম্প্রসারিত রূপ। নারীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে দেশ গড়ার যে কারিগর নরেন্দ্র মোদী, এই পদক্ষেপ তাঁর সেই সংকল্পেরই জয়গান। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সংসদের অধিবেশন যখন আবার বসবে, তখন হয়তো ভারত দেখবে এক নতুন ভোরের সূচনা— যেখানে নারী শক্তি আর শুধু স্লোগানে নয়, সংসদীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে ।
