একদিকে যখন দেশজুড়ে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে এবং শাসকমহল থেকে ‘নারী শক্তি’ ও নারী ক্ষমতায়নের লম্বা চওড়া বুলি আওড়ানোর তোড়জোর চলছে, ঠিক তখনই বাংলার বুকে ঘটে গেল এক চরম লজ্জাজনক ও নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে মধ্যরাতে নিজের এলাকাতেই সরকারি সার্কিট হাউস খালি করে বেরিয়ে যেতে বললেন অতিরিক্ত জেলা শাসক। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশাসনিক ক্ষমতার এই নগ্ন অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে প্রচণ্ড তোলপাড়।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তিনি জানান, নিজের সংসদীয় এলাকার সার্কিট হাউসে তিনি নিয়মমাফিক রাত কাটাচ্ছিলেন। সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে তিনি সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেন এবং তাঁকে বরাবরের নির্ধারিত রুমটিই বরাদ্দ করা হয়। রাত ৯:২০ নাগাদ ঘরে রাতের খাবার দেওয়ার পর, ঠিক ৯:৪৭ মিনিটে তাঁর কাছে অতিরিক্ত জেলা শাসকের ফোন আসে এবং অবিলম্বে ঘর খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়! শুধু তাই নয়, রাত ১০:৫২ নাগাদ একটি লিখিত নোটিশ বা নির্দেশের মাধ্যমে তাঁকে সরকারি ঘর ছাড়তে বলা হয়।
সাংসদ স্পষ্ট অভিযোগ করেন যে, সার্কিট হাউসের গেটের বাইরে তখন এক বিপুল জনতা জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছিল এবং এক থমথমে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তার ওপর একজন মহিলা—তাঁর সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার বদলে মধ্যরাতে তাঁকে রাস্তায় ঠেলে দেওয়ার এমন প্রশাসনিক দুঃসাহস কীভাবে সম্ভব, তা নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। তবে শাসকের রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনোভাবেই এই অন্যায়ের সামনে নতিস্বীকার করবেন না এবং একচুলও সরবেন না।
এই নজিরবিহীন ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সোচ্চার হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মহুয়ার ভিডিও বার্তা শেয়ার করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—এটিই কি বর্তমান জমানায় নারীদের সুরক্ষার নমুনা? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ঢাল বানিয়ে একজন মহিলা সাংসদকে এভাবে মাঝরাতে হেনস্থা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা কেবল একজন সাংসদের ওপর হামলা নয়, বরং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ওপর এক বিরাট আঘাত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী—যাঁরা প্রতিনিয়ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারী সুরক্ষার কথা বলেন, এই ঘটনা তাঁদের সমস্ত দাবির ফাঁপা রূপটিকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে দিল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “যারা রাজনৈতিকভাবে লড়াই করতে পারে না, তারাই প্রশাসনিক ভয় দেখিয়ে একজন মহিলাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সম্মান কাড়া যায় না, আর অধিকার লড়াই করেই আদায় হয়।” সার্কিট হাউসের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক-বিরোধী তরজা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
