ভোট চলে এসেছে আর প্রচার হবে না এমনটা তো হয় না। বরং, এটাই তো সময় রাস্তায় নেমে প্রার্থীদের ঘাম ঝরানোর। কিন্তু তাই বলে নির্দিষ্ট কোনো দলের হয়ে প্রচারে নামলো কিনা খোদ BLO! কি, কথাটা শুনে আপনিও চমকে উঠলেন বুঝি? তাহলে পুরো বিষয়টা শুনুন, এতে আরও চমকে উঠবেন। প্রচারের রমরমা চলছে গোটা বাংলা জুড়ে। এমন আবহে শাসক দলের তরফেও চলছে জোরদার প্রচার। আর এই শাসক দলের হয়ে প্রচারের কাজ করার অভিযোগ উঠল পাঁচজন BLO-দের বিরুদ্ধে। না, শুধু অভিযোগ ওঠেনি, তাদের একেবারে সাসপেন্ড করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে বলে রাখি, ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থায় BLO বা বুথ স্তরের আধিকারিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তারা মূলত নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেন। তবে, আজকাল বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে এবং সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই নজরে পড়ছে কিছু BLO নাকি রাজনৈতিক দলের হয়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। আর এবার এমনই ঘটনা আবারও উঠে এল শিরোনামে।
জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত পাঁচ BLO–দের মধ্যে ৩ জন উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর বিধানসভা কেন্দ্রের, আর বাকি ২ জন বীরভূমের দুবরাজপুর এবং ময়ূরেশ্বরের। ইতিমধ্যেই ওই ৫ জনের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। কমিশন সূত্রে খবর, এই ৫ BLO-র বিরুদ্ধেই প্রমাণ-সহ অভিযোগ জমা পড়েছে। আর সেই অভিযোগ পত্র থেকেই জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনার ৩ BLO হলেন, পার্ট নম্বর ২৮১-র অভিজিৎ দে, তপন কুমার সাহা—পার্ট নম্বর ২৮২ এবং কুমারজিৎ দত্ত—তার পার্ট নম্বর ২০৫। অভিযোগ জমা পড়তেই এদের ৩ জনকে শো-কজ় করেছিল কমিশন, কিন্তু তারা সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় সাসপেন্ড করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে FIR দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
অন্যদিকে, বীরভূমের দুবরাজপুরের আরেক BLO পার্ট নম্বর ১১২-র মঞ্জুরি চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে বসে ভোটার স্লিপ বিতরণ করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, ময়ূরেশ্বরের অভিযুক্ত BLO-র বিরুদ্ধে অভিযোগ, তৃণমূলের পতাকা লাগানো সাইকেলে করে তিনি ভোটার স্লিপ বিলি করছিলেন। অবশ্য নির্দিষ্ট প্রমাণ-সহ সেই অভিযোগও ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে। আর এই সকল অভিযোগের তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হতেই এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও FIR দায়ের করা হয়েছে। আসলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল— এর নিরপেক্ষতা। আর BLO-রা হলেন সেই সেতুবন্ধন, যারা ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে শুরু করে ভোটার কার্ড বিলি—সবই সরাসরি সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেন। কিন্তু যখনই এই পদের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার অভিযোগ ওঠে, তখন তা গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে!
যদিও ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, BLO-রা সম্পূর্ণভাবে অরাজনৈতিক ব্যক্তি হতে বাধ্য। কোনো প্রকার দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বা রাজনৈতিক প্রচার চালানো তাদের চাকরির শর্তাবলীর পরিপন্থী। যদি কোনো BLO কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার করেন, তবে তা ‘Model Code of Conduct’ তথা MCC বা নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। তাই গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে BLO-দের যে কোনো ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা ভীষণ দরকার বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি কিছু অসাধু আধিকারিক ব্যক্তিগত স্বার্থে বা চাপের মুখে পড়ে কোনো দলের প্রচারকের ভূমিকা পালন করেন, তবে তার দায়ভারও নির্বাচন কমিশনের উপরই বর্তায়। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতাই এই পক্ষপাতিত্বের কালচার থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পারে বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের।
