গঙ্গার ধারে যে শহরের প্রতিটি অলিগলিতে মিশে আছে মহাদেবের নাম, সেই পুণ্যভূমিতেই এবার তৈরি হচ্ছে ক্রিকেটের এক নতুন তীর্থক্ষেত্র। বারাণসী মানেই মন্দির, ঘাট, ঘণ্টাধ্বনি আর মহাদেবের আরাধনা। আর সেই শহরেই যখন ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি হয়, তখন তার সাজসজ্জাতেও যে শিবের ছোঁয়া থাকবে, সেটাই যেন স্বাভাবিক। প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার এই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম তাই শুধু ক্রিকেটের মাঠ নয়, হয়ে উঠতে চলেছে কাশীর ঐতিহ্য ও আধুনিক ভারতের এক অনন্য মেলবন্ধন।
স্টেডিয়ামে ঢুকলেই চোখে পড়বে মহাদেবের প্রতীক। ফ্লাডলাইটের নকশা করা হয়েছে ত্রিশূলের আদলে। যেন রাতের আকাশে আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে স্বয়ং মহাদেবের অস্ত্র। স্টেডিয়ামের ছাদে থাকবে অর্ধচন্দ্রের ছোঁয়া। আর মিডিয়া সেন্টারের নকশা হবে বিশাল ডমরুর মতো। অর্থাৎ মাঠের প্রতিটি কোণেই যেন কোনও না কোনওভাবে ধরা দেবে শিবের প্রতীক ও কাশীর আধ্যাত্মিক আবহ।
শুধু ত্রিশূল, ডমরু বা অর্ধচন্দ্রই নয়, স্টেডিয়ামের গ্যালারির সিঁড়িতেও থাকবে কাশীর ঘাটের ছাপ। বিশাল ধাতব বেলপাতার নকশাও সাজাবে এই ক্রিকেটের মন্দিরকে। ফলে এখানে ক্রিকেট দেখতে আসা দর্শক শুধু চার-ছক্কার উত্তেজনাই অনুভব করবেন না, একই সঙ্গে অনুভব করবেন কাশীর মাটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ। আধুনিক স্টেডিয়ামের বুকেও তাই জায়গা করে নিচ্ছে কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্য।
বারাণসীর রাজাতলব এলাকার গঞ্জারি গ্রামে প্রায় ৩০ একর জমির উপর তৈরি হচ্ছে এই বিশাল স্টেডিয়াম। ২০২৩ সাল থেকে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এই নির্মাণকাজ চালাচ্ছে। প্রকল্পটি তৈরি হচ্ছে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে। আর এখন নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গিয়েছে বলে খবর। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের অক্টোবরেই এই মাঠে ক্রিকেটের বল গড়াতে দেখা যেতে পারে।
প্রায় ৪০ হাজার দর্শক একসঙ্গে বসে খেলা দেখতে পারবেন এই স্টেডিয়ামে। শুধু তাই নয়, দর্শকদের সুবিধার জন্য থাকবে প্রায় ১৫০০ গাড়ি রাখার জায়গা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় ম্যাচ আয়োজন করার মতো পরিকাঠামোও থাকবে এখানে। বারাণসীর মতো একটি ঐতিহাসিক শহরে এমন আধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো তৈরি হওয়ায় শহরের পর্যটন ও অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বারাণসী এমনিতেই ভারতের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। পুরাণের বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বয়ং মহাদেবের প্রিয় এই শহরের প্রতিটি ঘাট, মন্দির আর গলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কাহিনি। শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই সারনাথ, যেখানে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্যের শহরেই এবার ক্রিকেটের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। তাই এই স্টেডিয়াম শুধুমাত্র খেলাধুলার পরিকাঠামো নয়, কাশীর সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরারও এক অভিনব প্রয়াস।
একদিকে গঙ্গার ঘাটে ভেসে আসবে আরতির আলো, অন্যদিকে সেই কাশীতেই রাতের আকাশ আলোকিত করবে ত্রিশূলের আদলে তৈরি ফ্লাডলাইট। মাঠে উঠবে ক্রিকেটের উত্তেজনা, গ্যালারিতে গর্জে উঠবেন হাজার হাজার দর্শক। আর মাথার উপর অর্ধচন্দ্রের নকশা যেন মনে করিয়ে দেবে—এ কেবল আর পাঁচটা স্টেডিয়াম নয়, এ মহাদেবের শহরের নিজস্ব ক্রিকেটের মন্দির। অক্টোবরের অপেক্ষায় এখন বারাণসী। অপেক্ষা সেই দিনের, যেদিন কাশীর মাটিতে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বল গড়াবে।
