ভোট পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই বহু প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র জমাও পড়ে গিয়েছে। আর তারপরই তাদের হলফনামায় উল্লেখিত সম্পত্তির পরিমাণ একে একে সামনে উঠে আসছে। রত্না দেবনাথের পর বিজেপির আরেক দরিদ্র প্রার্থী রেখা পাত্র-র সম্পত্তির পরিমাণ এবার প্রকাশ্যে এসেছে। সন্দেশখালি আন্দোলনের অন্যতম এই মুখ সাধারণ গৃহবধূর জীবন থেকে পা রেখেছেন রাজনীতির ময়দানে। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাকে বসিরহাট আসনে প্রার্থী করেছিল। না, সেখানে জয়ের হাসি তিনি হাসতে পারেননি! তবে, সেই নির্বাচন শেষ করে ২ বছর পেরিয়ে এবার পালা বিধানসভা নির্বাচনের। আর এবারও সেই রেখা পাত্রের উপরেই ভরসা রেখেছে পদ্ম শিবির। হিঙ্গলগঞ্জের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। সেই সুবাদে নিজের মনোয়ন পত্র পেশ করেছেন ওই প্রার্থী। যেখান থেকে জানা গিয়েছে বর্তমানে তার সম্পত্তির পরিমাণ।
হলফনামা অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের দ্বীপ অঞ্চল সন্দেশখালির এক অভাবী পরিবারের বধূ রেখা পাত্র। যার জীবনে প্রতিনিয়ত দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাই মূল লক্ষ্য। তবে, এত কিছুর পরও প্রার্থী মনোনয়নের হলফনামাতে তাকে নিজের আর্থিক সম্পত্তির উল্লেখ করতে হয়েছে। যেখানে দেখা গিয়েছে, রেখা পাত্র যখন মনোনয়ন পেশ করেছেন সে সময় তার হাতে নগদ ৩০ হাজার টাকা ছিল। তার মোট দুটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, আর তাতে রয়েছে মোট ৩৮ হাজার ২৩২ টাকা। না, বিজেপি-র এই প্রার্থী-র কোনো বিনিয়োগ নেই। না তো সোনা বা কোনো গাড়ি রয়েছে। অর্থাৎ, একেবারেই সাদামাটা জীবন কাটান রেখা। আর তার এই সকল অস্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে মোট ৬৮ হাজার ২৩২ টাকা রয়েছে।
অন্যদিকে, একই আর্থিক অবস্থা রেখার স্বামীরও। তার হাতে নগদ ১০ হাজার টাকা ও ব্যাঙ্কে ৯ হাজার ৯১৭ টাকা রয়েছে। না, তার নামেও কোনো গাড়ি, বাড়ি কিছু-ই নেই। উল্লেখ্য, রেখা পাত্র আর পাঁচজন মহিলার মতোই একজন সাধারণ গৃহবধূ। তিনি উত্তর বউঠাকুরানি এফপি বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন বলেই জানা গিয়েছে। তার স্বামী পেশায় একজন পরিযায়ী শ্রমিক। পেটের টানে ভিনরাজ্যে গিয়ে অর্জন করে সংসার চালান। রেখার ৩টি মেয়ে রয়েছে। তার বড় মেয়ে সুষমা-র বয়স ১৪ বছর। তার মেজ মেয়ে করবী-র বয়স ৯ বছর, আর ছোট মেয়ে কনকের বয়স মাত্র ৫ বছর। আর এই ছোট্ট ৩ সন্তানকে সামলেই রাজনীতি করে চলেছেন রেখা। যা অনেকের কাছেই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
প্রসঙ্গত, তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত নেতা শেখ শাহজাহান এবং তার অনুগামীদের বিরুদ্ধে সন্দেশখালির সাধারণ নারীরা যখন রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন রেখা পাত্রই প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং থানায় FIR দায়ের করেছিলেন। আর তার সেই প্রতিবাদী ভাবমূর্তিকে প্রাধান্য দিতেই বিজেপি তাকে প্রার্থী করে। যা বঙ্গবাসীদের কাছে এক বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, গেরুয়া শিবির “নির্যাতিতদের” পাশে আছে। তাছাড়া, তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই নারী ভোটকে তাদের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে গণ্য করে। তাই রেখা পাত্রকে সামনে এনে বিজেপি এই ন্যারেটিভ তৈরি করতে চেয়েছে যে গ্রাম-বাংলার নারীরা কেবল সরকারি ভাতার মুখাপেক্ষী নন, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতেও জানেন। অর্থাৎ, এটি তৃণমূলের নারী ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসানোর একটি সুপরিকল্পিত চাল বললেও ভুল বলা হবে না।
সবশেষে বলাই যায়, রেখা পাত্রকে প্রার্থী করা বিজেপির জন্য কেবল একটি নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। যার মাধ্যমে সন্দেশখালির আবেগকে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া এবং শাসকদলের বিরুদ্ধে “নারী নিগ্রহের” অভিযোগকে ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত করাই মূল লক্ষ্য। বলা ভালো, রেখা পাত্রের লড়াইকে সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে এসে বিজেপি সন্দেশখালি ইস্যুটিকে জাতীয় স্তরে প্রাসঙ্গিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া, রেখা পাত্র-কে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে বিজেপি বসিরহাট কেন্দ্রে একজন প্রার্থীর চেয়েও বেশি একজন ‘লিভিং সিম্বল’ বা জীবন্ত প্রতীক খুঁজে নিতে চেয়েছিল। তবে, ৪ঠা মে এই রেখা পাত্রের হাত ধরে হিঙ্গলগঞ্জে পদ্ম ফুটবে, নাকি জোড়া ফুলের দাপটে কুঁড়িতেই মূর্ছা যেতে হবে তা তো ব্যালট বাক্সে সাধারণ মানুষের জবাবেই জানা যাবে।
