বাংলায় SIR প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটেছে। নিষ্পত্তি হয়েছে বিচারাধীন অবস্থায় থাকা ভোটারদের নামও। যদিও এর জেরে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আর সেই ডিলিটেড নামের ভোটারদের এখন ভরসা ট্রাইব্যুনালে আবেদন। তবে, সেখান থেকেও নাম বাদ গেলে তাদের জন্য হয়তো হাজার অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করে রয়েছে। আর এই এত কিছু ভেবেই বিহারে SIR নির্দেশিকা জারি হতেই বাংলাতে-ও এমনটা হওয়ার আশঙ্কা জারি করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ, বর্তমানে তার আশঙ্কা-ই সত্যি হয়েছে! SIR-এর জেরে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে থাকা ভোটারের সংখ্যা ৭.৬ কোটি থেকে কমে ৬.৭৭ কোটি-তে পৌঁছে গিয়েছে। অর্থাৎ, ১১.৬% নাম বাদ পড়েছে SIR-এর কারণে। যা থেকে অনুমান করা যাচ্ছে, প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষের নাম বাদ গিয়েছে।
না, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম একবারে বাদ যায়নি। বরং, কয়েক দফায় বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যার মধ্যে প্রথম দফাতেই ৫৮.২ লক্ষ, দ্বিতীয় দফায় ৫.৪৬ লক্ষ এবং তৃতীয় দফাতে আরও ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। আর এই সব মিলিয়ে সংখ্যাটা মোট ৯০.৬৬ লক্ষতে দাঁড়িয়েছে। রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে। সেখানে নাম বাদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ। এরপর তালিকায় রয়েছে—উত্তর ২৪ পরগনা ৩.২৫ লক্ষ, ২.৩৯ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে মালদায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ২.২ লক্ষ এবং পূর্ব বর্ধমানে ২ লক্ষেরও বেশি নাম বাতিল হয়েছে। এদিকে রাজনৈতিক মহলে এই জেলাগুলি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কারণ ২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের ২০টি আসনের মধ্যে ১৮টি, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩৩টি আসনের মধ্যে ২৮টি, মালদার ১২টি আসন থেকে ৮টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১টি আসনের মধ্যে ৩০টি তৃণমূলের দখলে ছিল।
এদিকে বিচারাধীন থাকা বেশ কয়েকটি জেলা তথা নদীয়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতাতেও বেশ ভালো পরিমাণে নাম বাদ গিয়েছে। তবে, এই সব এলাকাতেও সেবার জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু এবার SIR-এর কারণে নাম বাদ পড়েছে, নদীয়ায় বিবেচনাধীন থাকা ভোটারদের প্রায় ৭৮ শতাংশের, হুগলিতে বাদ পড়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি, পূর্ব বর্ধমানে ৫৭ শতাংশ, উত্তর ২৪ পরগনায় ৫৫ শতাংশ এবং পশ্চিম বর্ধমানে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশেরও বেশি। এমনকি, কলকাতাতেও SIR-এর আঁচ পড়েছে! উত্তর কলকাতায় ২৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ কলকাতায় ২৭ শতাংশের বেশি নাম বাদ পড়েছে এই প্রক্রিয়ার কারণে। যদিও এই রিপোর্ট সামনে আসতেই শাসক দলের দাবি, কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে এই এলাকাগুলিতে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দিয়েছে। তবে। এতে তৃণমূলের ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না বলেই দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তার এই দাবি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা তো ৪ঠা মে ফলাফল ঘোষণার পরই জানা যাবে।
বলে রাখা ভালো, বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে SIR মডেলের প্রয়োগ একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। নির্বাচনের আগে ভোটারদের মানসিকতা এবং রাজনৈতিক ঝড়ের গতিপ্রকৃতি এই গাণিতিক মডেলের মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালো বোঝা সম্ভব বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ নির্বাচনের আগে সাধারণ ভোটাররা রাজনৈতিক প্রচারণার সংস্পর্শে আসে। ফলে যখন কোনো একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ‘হাওয়া’ জোরালো হয়, তখন ভোটাররা দ্রুত তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। যার জেরে বাংলার ভোটের ইতিহাসে এই ‘সুইং ভোটার’দের ভোটই সবসময় নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশ দাবি করছেন, বাংলার ভোট কেবল বুথের লড়াই নয়, এটি আসলে কোটি কোটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের এক গাণিতিক খেলা। ফলে যে দল এই SIR চক্রকে সঠিকভাবে অনুধাবন করে নিজেদের প্রচারণার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে।
