ভারতের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর অংশে রয়েছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড শিলিগুড়ি করিডর। অনেকেই একে ‘চিকেন নেক’ নামেই চেনেন। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই করিডরই উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। একদিকে নেপাল, অন্যদিকে বাংলাদেশ মাঝখানে এই সরু করিডর। তাই কৌশলগত এবং সামরিক দিক থেকে এটি ভারতের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা। আর এবার সেই চিকেন নেক নিয়েই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিতর্ক। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন বিজেপি সরকার এই করিডর সংলগ্ন প্রায় ১২০ একর জমি কেন্দ্র সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের দাবি, এই জমি ব্যবহার করা হবে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে, বিএসএফের ফেন্সিং বাড়াতে, জাতীয় সড়ক নির্মাণে এবং কৌশলগত পরিকাঠামো তৈরিতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবার বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে কেন্দ্র এবং রাজ্য। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত মোট প্রায় ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গের অংশই ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এখনও প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার সীমান্তে ফেন্সিং বাকি রয়েছে। তার মধ্যেও ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত দুর্গম।সরকারি সূত্রের দাবি, এবার সেই এলাকাগুলিতেও দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করা হবে।
শুধু তাই নয়, চিকেন নেক এলাকায় তৈরি হতে পারে আন্ডারগ্রাউন্ড রেল নেটওয়ার্কও। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য একটাই যদি ভবিষ্যতে কোনও যুদ্ধ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সড়কপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলেও যেন সেনাবাহিনী এবং রসদ দ্রুত উত্তর-পূর্ব ভারতে পৌঁছতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করিডর নিরাপদ রাখা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই করিডরে বড়সড় কোনও অস্থিরতা তৈরি হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে।
এই প্রসঙ্গেই আবার সামনে এসেছে ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার অভিযুক্ত শারজিল ইমামের বিতর্কিত মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, যদি বড় সংখ্যায় মানুষ একত্রিত হয়, তাহলে ‘চিকেন নেক’ বন্ধ করে উত্তর-পূর্ব ভারতকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
সেই মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকেই কেন্দ্র সরকার এই করিডরের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিজেপির অভিযোগ, আগের তৃণমূল সরকার নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে পর্যাপ্ত জমি বা অধিকার দিতে আগ্রহ দেখায়নি।
অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, এই ইস্যুকে রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের মানুষই দেশপ্রেমিক এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। তবে বর্তমান সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় ফেন্সিং, রাস্তা, নজরদারি এবং প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা হবে। এছাড়াও বিএসএফের কার্যক্ষমতা বাড়ানো নিয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যেই সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের অধিকার ক্ষেত্র ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করেছে। অর্থাৎ এখন সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় তল্লাশি, গ্রেফতার এবং বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রয়েছে বিএসএফের হাতে। সব মিলিয়ে চিকেন নেক এখন শুধু একটি করিডর নয়, এটি ভারতের নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত ভবিষ্যতের অন্যতম বড় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।