একসময় যে গান ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের বুকের ভিতর আগুন জ্বালিয়েছিল
সেই বন্দে মাতরম্-এর মর্যাদা এবার রক্ষিত হবে আইনের কঠোর ছত্রছায়ায়
এত দিন জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন -র অপমান শাস্তিযোগ্য হলেও
জাতীয় গানের ক্ষেত্রে তেমন নির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা ছিল না এবার সেই ছবিটাই বদলে গেল
রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বন্দে মাতরম্-র ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা পরিবেশনে
বাধা দেওয়া হলে হতে পারে জেল, জরিমানা, এমনকী দুটিই স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষের আগে জাতীয় গানকে ঘিরে এই বড় সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে
কেন এখন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বন্দে মাতরম্-কে?
কী বদলাল আইনে?
আর এবার থেকে জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষায় কতটা কড়া হবে প্রশাসন?
‘বন্দে মাতরম্’-কে ঘিরে এবার বড় আইনি পরিবর্তন হল। এত দিন জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’-এর অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’-এর ক্ষেত্রে একই ধরনের নির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা ছিল না। নতুন সংশোধনের ফলে সেই ফারাকটা অনেকটাই দূর হল। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি এবার সরাসরি আইনের আওতায় চলে এল।
এর অর্থ, ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের সময় ইচ্ছাকৃত ভাবে বাধা দেওয়া বা ইচ্ছাকৃত ভাবে তার অবমাননা করা হলে আর বিষয়টি শুধুমাত্র সামাজিক বা নৈতিক দৃষ্টিতে দেখা হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিন বছর পর্যন্ত জেল, জরিমানা অথবা দু’টিই হতে পারে। অর্থাৎ জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষায় এবার প্রশাসনের হাতে আরও শক্ত আইনি অস্ত্র থাকছে।
তবে এই জায়গায় একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গানের সম্মান রক্ষা করা এবং কাউকে জোর করে গান গাওয়ানো দুটি এক বিষয় নয়। আইনের আসল প্রয়োগ হওয়া উচিত ইচ্ছাকৃত অপমান বা অনুষ্ঠানে ইচ্ছাকৃত বিঘ্ন ঘটানোর ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মত, অনীহা বা অন্য কোনও আচরণকে যেন নির্বিচারে ‘অপমান’ হিসেবে চিহ্নিত না করা হয়, সেটিও দেখতে হবে। কারণ জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সময়টার দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর পূর্তি ঘিরে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি চলছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই গানকে কেন্দ্র সরকার গত কয়েক মাসে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি অনুষ্ঠানে কীভাবে গানটি পরিবেশন করা হবে, কতগুলি স্তবক গাওয়া হবে—সেই সংক্রান্ত নিয়মও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রতীকী পরিবর্তন দেখা যাবে এবারের স্বাধীনতা দিবসে। লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে প্রথমে ‘বন্দে মাতরম্’ এবং তার পরে ‘জনগণমন’ পরিবেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এত দিন স্বাধীনতা দিবসের এই অনুষ্ঠানে মূলত জাতীয় সঙ্গীতই সামনে থাকত। ফলে এবার ‘বন্দে মাতরম্’-কে সামনে নিয়ে আসার মধ্যে একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।কারণ ‘বন্দে মাতরম্’ শুধু একটি দেশাত্মবোধক গান নয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে এই গান গভীরভাবে জড়িত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই গান বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই গানটির সঙ্গে জাতীয় আবেগ, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং দেশাত্মবোধ—তিনটিই জড়িয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই সংশোধনকে শুধু একটি নতুন শাস্তির বিধান হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরো গুরুত্ব বোঝা যাবে না। জাতীয় জীবনে ‘বন্দে মাতরম্’-এর মর্যাদা আরও স্পষ্ট এবং শক্তিশালী করার দিকে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। তবে আগামী দিনে আসল প্রশ্ন হবে এই আইন কতটা সংবেদনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হয়। জাতীয় গানের সম্মান যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, আবার সেই সম্মানের নামে নাগরিক অধিকারও যেন ক্ষুণ্ণ না হয় ভারসাম্যটা সেখানেই।
