চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পত্র জমা দিলেন অভয়ার মা তথা বিজেপির নতুন প্রার্থী রত্না দেবনাথ। তবে, এদিন রাজনীতির ময়দানে রুক্ষতার বদলে ধরা পড়ল এমন এক মুহূর্ত যা রাজনীতির উর্ধ্বে গিয়ে মানুষের মন ছুঁয়ে গেল। এদিন জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথ। যদিও তিনি কেবল একজন প্রার্থী-ই নন, তিনি রাজ্য রাজনীতিতে আরজি করের সেই ‘অভয়া’র মা হিসেবে এক পরিচিত নাম। এদিন মনোয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময় রত্না দেবনাথের সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী ও অসংখ্য বিজেপি কর্মী-সহ ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব ও বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। যদিও তার এই মনোয়ন পেশকে কেন্দ্র করে এলাকায় এক আলাদাই উন্মাদনা ছিল এদিন।
আসলে রত্না দেবনাথের মনোয়ন পেশ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করেছিল বিজেপি। আর এই অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। না, এদিনের জনসভায় রাজনীতিক স্মৃতি ইরানিকে নয়, বরং এক সংবেদনশীল নারীকে দেখলেন উপস্থিত জনগণ। বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আজ রত্না দেবনাথের চোখের জল দেখে আমার বুক কেঁপে উঠেছে। একজন মা যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিচার চেয়ে কাঁদেন, তখন বুঝতে হবে এই রাজ্যে আইনের শাসন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। মমতা দিদি, আপনিও একজন নারী, আপনি কি এই মায়ের কান্না শুনতে পাচ্ছেন না?”
এদিন জনসভায় বক্তব্য রাখেন খোদ রত্না দেবনাথ-ও। নিজের মেয়ের কথা বলতে গিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে মাইকের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এদিন নিজের ভাষণের শুরুতেই বিজেপি প্রার্থী বলেন, “আমি আজ এখানে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আসিনি, এসেছি একজন মা হিসেবে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, কিন্তু আজও তার বিচার পাইনি। বাংলার ঘরে ঘরে আজ মেয়েরা নিরাপদ নয়। আমি চাই না আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি হোক। আপনারা কি আমার পাশে দাঁড়াবেন না? এই লড়াই আমার একার নয়, এই লড়াই আপনাদের সবার।” এমতাবস্থায় স্মৃতি ইরানি দ্রুত এগিয়ে এসে রত্না দেবনাথকে জড়িয়ে ধরেন। তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন। যদিও স্মৃতির চোখেও তখন জল দেখা যাচ্ছিল। এরপর দীর্ঘক্ষণ রত্না দেবনাথের হাত ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি, যেন এক বোন অন্য এক বোনের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে লড়াই করার শক্তি দিচ্ছেন। কিছুটা সময়ের পর নিজেকে সামলে নিয়ে রত্না দেবনাথ ফের ভাষণ শুরু করেন। তিনি বলেন, “এক ৯ তারিখেই আমার কাছে এসেছিল আমার মেয়ে। আমার মনে হয়েছিল যে তাকে পেয়ে আমি গোটা পৃথিবীকে পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু আবার সেই ৯ তারিখেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাকে। তাই আমি এই ৯ তারিখটাই বেছে নিয়েছি মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য।”
এদিন তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি-ও। নিজের ভঙ্গিতে তিনি এদিন বলেন, “রত্না দেবী আজ একা নন। আমরা সবাই, সারা ভারতবর্ষ তাঁর পাশে আছে। উনি কেবল পানিহাটির প্রার্থী নন, উনি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মুখ। আপনারা তাকে আশীর্বাদ করুন। এই লড়াই তিলতিল করে জমানো ক্ষোভের লড়াই। আমরা এই লড়াইয়ের শেষ পর্যন্ত লড়ব এবং অভয়া বিচার পাবেই।” তিনি আরও বলেন, “যে সরকার মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সরকার অপরাধীদের আড়াল করে, সেই সরকারকে উপড়ে ফেলার সময় এসেছে। রত্না দেবনাথের জয় হবে পানিহাটির প্রতিটি মেয়ের জয় হবেই। মা হয়ে মায়েদের কষ্ট বুঝি। তাই বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।” বর্তমানে পানিহাটির এই দৃশ্য সমাজমাধ্যমে বেশ ভাইরাল। আর সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে, রত্না দেবনাথের এই আবেগ কি ২৬-এর নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চলেছে? এ বিষয়ে আপনার কী মত? কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।
