মোদী সরকারের তথাকথিত ‘সুশাসন’ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি যে আসলে স্রেফ একখানা ফাঁপা ঢাকের আওয়াজ, তা ফের একবার হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে গেল। প্রযুক্তিগত গবেষণার প্রসারের দোহাই দিয়ে সরকারি তোষাখানা থেকে মেগা ঋণ প্রকল্পের নামে কীভাবে কোটি কোটি টাকা নিজেদের পছন্দের কর্পোরেট বন্ধুদের পকেটে চালান করা হয়েছে, তার এক বিস্ফোরক তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। সিএজি-র চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট ও সংসদে পেশ হওয়া তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে যে, মোদী সরকারের তৈরি বিশেষ ঋণ বন্টন প্যানেলের সদস্যরা নিজেরাই নিজেদের পকেটে পুরেছেন মোট বরাদ্দ ঋণের সিংহভাগ টাকা!
ঘটনার সূত্রপাত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনে দেশের প্রযুক্তিগত গবেষণাকে উৎসাহিত করতে ১ লক্ষ কোটি টাকার ‘রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট, ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনকে কেন্দ্র করে।
এই তহবিলের অংশ হিসেবে প্রথম দফায় ২২টি নামজাদা বেসরকারি সংস্থাকে নামমাত্র ২.৭ শতাংশ সুদে এবং সম্পূর্ণ জামানত ছাড়াই ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী মেগা ঋণ বরাদ্দ করা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ২,১৯২ কোটি টাকা। কিন্তু কাদের এই কোটি কোটি টাকার উপহার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য যে বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল, তার গঠন দেখলে যে কোনো সাধারণ নাগরিকের চোখ চড়কগাছে উঠবে। কমিটির ২২ জন সদস্যের মধ্যে সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন মাত্র এক জন, যাঁর আবার কোনো ভোটাধিকারই ছিল না! বাকি ২১ জন সদস্যই ছিলেন দেশের নানা বড় বড় প্রাইভেট টেকনোলজি কোম্পানির মালিক কিংবা প্রতিনিধি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঋণ প্রাপক নির্ধারণকারী সেই সরকারি কমিটির ২১ জন বেসরকারি ক্যাপিটালিস্ট সদস্যের মধ্যে ১৫ জন সদস্য এমন সমস্ত সংস্থার কর্তাব্যক্তি, যাঁরা নিজেরাই এই ২,১৯২ কোটি টাকার সরকারি ঋণ হাতিয়ে নিয়েছেন! অর্থাৎ সোজা কথায়, ‘যাঁরা পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁরাই খাতা দেখে নিজেদের ১০০-তে ১০০ দিয়েছেন’। হিসেব বলছে, সরকারি কোষাগারের ১৩৭৭ কোটি টাকা মোট ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশ পকেটে পুরেছে সেই সমস্ত সংস্থাই, যাদের মালিকরা মোদী সরকারের এই প্যানেলে চেপে বসেছিলেন।
সাংসদ প্রবীণ চক্রবর্তীর প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং নিজেই সংসদে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ঋণপ্রাপক সংস্থাসমূহের সঙ্গে কমিটির সদস্যদের সুস্পষ্ট আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। এমনকি ‘টেকনলজি ডেভলপমেন্ট বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান সৌরভ শ্রীবাস্তবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা ৯টি সংস্থাই এই মোটা টাকার ঋণ হাসিল করে নিয়েছে। এছাড়াও ন্যাসকম, টাটা গ্রুপ, টিভিএস ক্যাপিট্যাল, পিনাকল ইন্ডাস্ট্রি ও টেজার নেটওয়ার্কের মতো বড় বড় কর্পোরেট রাঘববোয়ালদের প্রতিনিধিরা নিজেদের চেয়ারের দাপট দেখিয়ে অনায়াসে কোটি কোটি টাকার সরকারি ধন লুটে শামিল হয়েছেন।
মোদী জমানায় কোটি কোটি টাকা গায়েব হওয়া এখন আর কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং নিত্যদিনের সরকারি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। দেশি-বিদেশি গবেষণার নামে করের টাকা দিয়ে ধনকুবেরদের তোষণ—বিজেপি সরকারের আর্থিক দেউলিয়াপনা ও দুর্নীতির নগ্ন চেহারা ফের প্রকাশ্যে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
