দুর্নীতি, তোলাবাজি এবং জোরপূর্বক জমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মুখ ফুলিয়ে ‘জিরো টলারেন্স’-এর জ্ঞান বিলিয়ে থাকেন বিজেপি নেতৃত্ব। কিন্তু সেই বিজেপির নিজের ঘরেই যে তোলাবাজি, জবরদখল এবং অন্যের সম্পত্তি হাতানোর মতো গুরুতর অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা ফের একবার প্রমাণ হয়ে গেল। উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে আস্ত একটি তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়ি এবং চার বিঘা জমি গায়ের জোরে দখল করে রাখার গুরুতর অভিযোগ। আর এই নালিশ জানাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতার দরবারে’ হাজির হতে হয়েছে খোদ এক বিজেপি সমর্থক সাধুকে!
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গিয়েছে, হিঙ্গলগঞ্জের লেবুখালি এলাকার বাসিন্দা কেশবানন্দ মহারাজের চার বিঘা জমির ওপর নির্মিত ‘কেশবানন্দ প্যালেস’ নামের তিনতলা বাড়িটি গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটের প্রচার চালানের জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন বিজেপির তারকা প্রার্থী তথা বর্তমান বিধায়ক রেখা পাত্র। কিন্তু ভোটে জিতে বিধায়ক হওয়ার পর থেকেই তাঁর আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। অভিযোগ, প্রথম দু’মাসের সামান্য টাকা দিয়েই খালাস, গত তিন মাসের কোনো ভাড়াই পরিশোধ করেননি রেখা। এমনকি নির্বাচন মিটে যাওয়ার এত মাস পর কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সেই বাড়ি দখল করে বসে থাকলেও, বাড়ি ছাড়তে কিংবা ভাড়া মেটাতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন বিধায়ক।
ভুক্তভোগী কেশবানন্দ মহারাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি নিজে বিজেপি সমর্থক বলেই বিশ্বাস করে রেখা পাত্রকে নিজের বাড়ি ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায় বাড়িটি কিনে নেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, আজ পর্যন্ত রেখা টাকা মেটাননি, বাড়ি ফাঁকাও করছেন না। উল্টে ভাড়ার টাকা বা বাড়ি ফেরত চাইতে গেলে বিধায়ক এবং তাঁর লোকজন চরম দুর্ব্যবহার ও হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত বিচারের আশায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দরবারে এসে বিধায়কের বিরুদ্ধে লিখিত নালিশ জানাতে বাধ্য হয়েছেন ওই সাধু।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই নিজের দোষ ঢাকতে আজব ও অসংলগ্ন অজুহাত খাড়া করেছেন বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র। তাঁর দাবি, পা ভেঙে যাওয়ার কারণে তিনি নাকি বিধানসভায় গিয়ে সই করতে পারেননি, যার ফলে তাঁর মাইনে মেলেনি! কিন্তু রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন—এক জন জনপ্রতিনিধি নিজের মাইনে পাননি বলে অন্যের কোটি টাকার সম্পত্তি জোর করে দখল করে রাখবেন, এ কেমন যুক্তি? নিজের মেকি অজুহাত দিয়ে শাসকদলের এই বিধায়ক কি নিজের স্বৈরাচারী ও দখলদার মানসিকতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করছেন না?
নিজেদের দলের বিধায়কের বিরুদ্ধে এমন প্রত্যক্ষ জমি দখলের অভিযোগ ওঠায় তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। সততার ঢাক পেটানো বিজেপির জবরদখলের এই ঘটনা সাধারণ মানুষের সামনে শাসকদলের দেউলিয়া মানসিকতাকে পুরোপুরি নগ্ন করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে ক্ষমতায় আসা বিজেপি বিধায়করা এখন নিজেরাই কীভাবে জমি হাঙ্গর ও তোলাবাজে পরিণত হয়েছেন, রেখা পাত্রের ঘটনা তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
